প্রকাশিত: / বার পড়া হয়েছে
এগারো দিনের জমজমাট আয়োজনের পর পর্দা নামল কানাডার মর্যাদাপূর্ণ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (টিআইএফএফ) ৫১তম আসরের। লালগালিচা, তারকাদের উপস্থিতি ও বিশ্বের নানা প্রান্তের শত শত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতে মুখর ছিল এবারের আসর।
যেখানে পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে গাজা, ভারতের নাগাল্যান্ড, কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং দর্শকের নিজস্ব পছন্দ। তারকানির্ভর আকর্ষণের পাশাপাশি টরন্টোর এবারের আসর দেখিয়েছে, দর্শকের রুচিতেও আসছে উল্লেখযোগ্য বদল। পরিচিত মুখের বাইরে ভিন্ন ভূ-খণ্ড, ভাষা ও সংস্কৃতির গল্পও এখন প্রেক্ষাগৃহে টানছে তরুণ দর্শকদের। অচেনা বাস্তবতার গল্পের প্রতি এ আগ্রহই যেন উৎসবের নতুন দর্শক তৈরি করছে।
দর্শকের ভোটে পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে স্পেনের হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসির লা বোলা নেগ্রা। ১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭—তিনটি সময়জুড়ে তিন পুরুষের জীবন, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণার গল্প বলা ছবিটি এর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও আলোচনায় ছিল। প্রথম রানারআপ পিটার ফ্যারেলির আই প্লে রকি, দ্বিতীয় রানারআপ শান হেডারের বিইং হিউম্যান।
আন্তর্জাতিক বিভাগে দর্শকের পছন্দের শীর্ষে ছিল সাইমন স্টোনের এলসিনোর। আর তথ্যচিত্র বিভাগে ব্যারি অ্যাভরিচের ডার্লিন লাভ: আই নো হোয়্যার আই’ভ বিন এবং মিডনাইট ম্যাডনেসে ম্যাথিউ র্যানকিনের লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ব্রায়ান মুলরোনি পেয়েছে পিপলস চয়েস স্বীকৃতি।
কিন্তু উৎসবের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছবিগুলোর একটি এসেছে ফিলিস্তিনের গাজা থেকে। ফিলিস্তিনি নির্মাতা হোসাম আবু দানের থার্টিন ইন গাজা জিতেছে নেটপ্যা ক অ্যাওয়ার্ড। ৭৭ মিনিটের এ সিনেমায় উঠে এসেছে যুদ্ধের মধ্যে শরণার্থী শিবিরে বাবার সঙ্গে থাকা ১৩ বছরের রাঘাদের কৈশোর, নিরাপত্তাহীনতা ও বেড়ে ওঠার গল্প। গাজাতে স্থানীয় ফিলিস্তিনি কলাকুশলীদের নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি মানুষের দুর্ভোগকে শুধু ‘ভুক্তভোগিতা’ হিসেবে না দেখিয়ে জীবনের জটিলতাকে তুলে ধরার জন্য জুরি বোর্ডের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ভারতের জন্যও এসেছে বড় অর্জন। থেজা রিওর আং জিতেছে প্লাটফর্ম প্রাইজ। ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাগাল্যান্ডের একটি গ্রামের শেষ জীবিত প্রধানকে ঘিরে নির্মিত ছবিটির অধিকাংশ সংলাপ ছিল কোনিয়াক ভাষায়।
কানাডীয় চলচ্চিত্রেও ছিল নিজস্ব স্বর। কোডি লাইটনিংয়ের স্মাজ দ্য ব্লেডস পেয়েছে বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড। আদিবাসী জীবন, ঔপনিবেশিকতার অভিঘাত, পরিবার ও সম্প্রদায়ের শক্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি জিতে নিয়েছে পুরস্কারের জয়মাল্য। অন্যদিকে বেস্ট কানাডিয়ান ফিচার ফিল্ম হয়েছে সারভিল পোবলেতের সানবার্ন। টরন্টোর ব্লিকার স্ট্রিটের কিশোর-কিশোরীদের বেড়ে ওঠার গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটিকে জুরি বোর্ডের মূল্যায়নে প্রাণবন্ত, হাস্যরসাত্মক ও গভীরভাবে মানবিক বলে বিবেচিত হয়েছে। সম্মানজনক উল্লেখ পেয়েছে ম্যান ইন মোশন: দ্য রিক হ্যানসেন স্টোরি।
এছাড়া পপতারকা লিসার জীবনের একটি অধ্যায়কে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমা ‘অলওয়েজ লালিসা’ ছিল বিশেষভাবে আলোচনার অংশ। সু কিম পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্রটি এশিয় সিনেমার সক্রিয় উপস্থিতির এক অনন্য উদাহরণ। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। বিশ্বের নানা প্রান্তের গল্পের ভিড়ে টরন্টোর পর্দায় জায়গা করে নিয়েছে রুবাইয়াত হোসেনের দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড। আয়োজনে বাংলাদেশের এ উপস্থিতি শুধু অংশগ্রহণ নয়, দেশের গল্পকে বৈশ্বিক দর্শকের সামনে তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এবারের পুরস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রেখা দেখা গেছে ইতিহাস ও স্মৃতির ভেতর। ইউলা বেনিভলস্কির দ্য ব্ল্যাক বক্স ইজ অরেঞ্জ পেয়েছে বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি বিভাগের সম্মানজনক স্বীকৃতি। ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আর্কাইভাল ছবির মধ্য দিয়ে ছবিটি ফিলিস্তিনি ইতিহাস মুছে ফেলার প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ককে অনুসন্ধান করেছে।
সব মিলিয়ে টরন্টোর এবারের আসর শুধু সিনেমার প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল বিভিন্ন ভূ-খণ্ডের মানুষের নিজস্ব গল্প বলার জায়গা। দর্শকের পছন্দ থেকে জুরির সিদ্ধান্ত—উভয়ে উঠে এসেছে পরিচয়, স্মৃতি, যুদ্ধ, জীবন, পরিবার ও নিজস্ব ইতিহাসের কথা। ১১ দিনের উৎসব শেষ হয়েছে গত রোববার, কিন্তু সেই গল্পগুলো এখন উৎসবের পর্দা পেরিয়ে আরো দূরের দর্শকের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।